কদমফুলের ঘ্রাণে বর্ষার আগমনী বার্তা

চ্যানেল ৯৬বিডি.কম,

শামীম আহসান : আকাশ কখনো স্বচ্ছ, কখনোবা কালোমেঘে ছেয়ে যাচ্ছে। চলছে অবিরত কালোমেঘের ডাকাডাকি। এ যেন প্রকৃতিতে চলছে আলোআধারির লুকোচুরি। এভাবেই আষাঢ়ের আগমনী বার্তা দিচ্ছে প্রকৃতি।

সেই সাথে জ্যৈষ্ঠের পড়ন্ত বিকেলে ঘন সবুজ পাতার আড়ালে চোখ জুড়ানো সুরভিমাখা কদমফুল। চিরচেনা কদম বৃক্ষের ডালে ঝুলে থাকা হলুদ-সাদা রঙের ফুল ভাসছে। যেন হাতছানি দিয়ে বর্ষাকেই কাছে ডাকছে কদমফুল।

দিনপঞ্জিকার পাতায় আষাঢ় আসতে বাকি আরও ২ দিন। এরই মাঝে প্রকৃতিতে কদমের ঘ্রাণ। বর্ষার সঙ্গে ভালোবাসার নিবিড় সম্পর্কে ফুলে ফলে ছেয়ে গেছে কদমগাছ।

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে হাজারো বৃক্ষরাজির ভিড়ে শুভ্ররাগে হƒদয় রাঙানো কদম ফুল চোখে পড়ে। যা কাছে টানছে উদ্যানে আসা দর্শনার্থীসহ বৃক্ষ প্রেমীদেরও। নাগরিক জীবনের ব্যস্ততার ফাঁকে একটু অবসরে এখানে আসেন অনেকেই। খানিক সময়ে উপভোগ করেন বৃষ্টির সঙ্গে কদমের নিবিড় ভালোবাসা।

গাছগাছালিতে ভরা উদ্যানে জুড়ে কদমের ঘ্রাণে মন জুড়িয়ে যাবে, যে কারো। ব্যস্তজীবনে ইটপাথরের শহরে কদমের সেই শুভ্ররাগে হƒদয় রাঙিয়ে নেয়ার সুযোগ অনেকেই উপভোগ করতে পারেন না। একটু সময় হয়না অবসরের। যারা খানিক অবসর পান, ঘুরতে আসেন তারাই হয়তো উপভোগ করেন কদমবর্ষার মিতালি।

‘স্যার, লননা, ফুল গুলা লেন, বেশী ট্যাহা লাগবো না, বৃষ্টিত ভিইজ্যা গাছ থেইক্যা অনেক কষ্টে ফুল গুলান আনছি’ বৃহস্পতিবার সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে পাশে ১০-১২ বছরের মেয়েটি উদ্যানে ঘুরতে আসা একব্যক্তিকে এভাবেই ফুল কেনার জন্য অনুরোধ করছিল।

কিছুক্ষণ আগে গাছ থেকে পেড়ে আনা কদমফুল পানি দিয়ে ধুয়ে তোড়া বানিয়ে রাখছিল সে। মেয়েটির কথা শুনে সেগুনবাগিচার বাসিন্দা মো. হেমায়েত হোসেন নামের ওই ব্যক্তি কদমফুলের একটি তোড়া কিনেন।

মো. হেমায়েত হোসেন বলেন, বর্ষাকালের শুরুতেই তিনি উদ্যানে কদমফুলের খোঁজ করেন। পথশিশুরা উদ্যানের গাছ থেকে ফুলগুলো সংগ্রহ করে বিক্রি করে। তিনি তার ছোট মেয়ের জন্য কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা রবিউল ইসলামও কিনেছেন একগুচ্ছ কদম। তিনি বলেন ভালবাসা থেকেই কদম ফুল কেনা। ওরা কত কষ্ট করে। প্রয়োজন না হলেও কিনি। ছোট ছোট শিশুরা কত কষ্ট করে, ফুল কিনলে ওদের মুখে হাসি ফুটে। তাই কিনি।

ঋতু বৈচিত্র্যের এদেশে সাধারণত আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টিতেই কদম ফোটে। আবার কখনও কখনও বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠেও ফুটতে দেখা যায়। কদম বর্ণে, গন্ধে, সৌন্দর্যে এদেশের রূপসী তরুর অন্যতম। গাছ দীর্ঘাকৃতির।

কাণ্ড সরল, উন্নত, ধূসর থেকে প্রায় কালো এবং বহুফাটলে রুক্ষ, কর্কশ। পাতা বিরাট, ডিম্বাকৃতি, উজ্জ্বল সবুজ, তেল চকচকে এবং বিন্যাসে বিপ্রতীপ। শীতে সব পাতা ঝরে যায়। কিন্তু বসন্তে কচিপাতা আসে উচ্ছ্বাস নিয়ে।

কদম বর্ণে, গন্ধে, সৌন্দর্যে এ দেশের ফুল গাছগুলোর মধ্যে অন্যতম। গাছের উচ্চতা ৪০-৫০ ফুট। এর বৈজ্ঞানিক নাম- এন্থোসিফেলাস ইন্ডিকাস (অহঃযড়পবঢ়যধষঁং রহফরপঁং)। আদি নিবাস ভারতের উষ্ণ অঞ্চল, চীন ও মালয়ে। কদমগাছের পাতা লম্বা, উজ্জ্বল সবুজ ও চকচকে। কদম ফুল গোলাকার। কদম ফুলের আরেক নাম হল নীপ।

ফুলের সৌন্দর্যের মতো আরও কয়েকটি সুন্দর নাম রয়েছে- যেমন বৃত্তপুষ্প, সর্ষপ, ললনাপ্রিয়, সুরভি, মেঘাগমপ্রিয়, মঞ্জুকেশিনী, কর্ণপূরক, পুলকি, সিন্ধুপুষ্প ইত্যাদি।

পুরো ফুলটিকে একটি ফুল মনে হলেও এটি আসলে অসংখ্য ফুলের গুচ্ছ। এ ফুলের ভেতরে রয়েছে মাংসল পুষ্পাধার, যাতে হলুদ রঙের ফানেলের মতো পাপড়িগুলো আটকে থাকে। পাপড়ির মাথায় থাকে সাদা রঙের পরাগদন্ড।

ফল মাংসল, টক। এগুলো বাদুড় ও কাঠবিড়ালির প্রিয় খাদ্য। শুধু সৌন্দর্য নয়, ভেষজ গুণের পাশাপাশি কদমের রয়েছে অর্থনৈতিক গুরুত্বও। এই গাছের কাঠ দিয়ে কাগজ, দেয়াশলাই ছাড়াও তৈরি হয় বাক্সপেটরা। কদম গাছের বাকল জ্বরে উপকারী, ছাল ও পাতা ব্যথানাশক। মুখের ঘায়েও পাতার রস কার্যকরী।

বর্ষার সঙ্গে রয়েছে কদমের অঙ্গাঅঙ্গি সম্পর্ক। কারো কারো মতে কদম হলো বর্ষার দূত। বর্ষাকাল আর কদমফুল নিয়ে বহু বিখ্যাত কবিতা ও গান রয়েছে।কদম গাছের পাতা লম্বা, উজ্জ্বল সবুজ ও চকচকে। বসন্তের শুরুতে গাছে নতুন পাতা গজায় এবং শীতে গাছের পাতা ঝরে যায়।

পুরো ফুলটি একটি ফুল মনে হলেও এটি আসলে অসংখ্য ফুলের গুচ্ছ। যাতে হলুদ রঙের ফানেলের মতো পাপড়িগুলো আটকে থাকে। পাপড়ির মাথায় থাকে সাদা রঙের পরাগদণ্ড। ফল মাংসল, টক এবং বাদুড় ও কাঠবিড়ালির প্রিয় খাদ্য। ওরাই বীজ ছড়ানোর বাহন।