রাজধানীতে ভয়াবহ শব্দদূষণ, হুমকিতে স্বাস্থ্য

চ্যানেল ৯৬বিডি.কম,

ঢাকা : রাজধানীতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে শব্দ দূষণ। শব্দদূষণে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সর্বস্তরের মানুষ। রাজধানী ঢাকায় শব্দের মাত্রা নির্ধারিত মানমাত্রার চেয়ে তিন গুণ বেশি। কিন্তু শব্দদূষণের বিষয়ে তেমন সচেতনতা নেই।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, শব্দদূষণের কারণে ভুক্তভোগীদের হাইপারটেনশন, আলসার, হৃদরোগ, মাথাব্যথা, স্মরণশক্তি হ্রাস, স্নায়ুবিক সমস্যা ও মানসিক চাপ তৈরির আশঙ্কা থাকে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং পরিবেশ অধিদফতর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ঢাকায় শব্দদূষণের প্রধানতম উৎসগুলো হচ্ছে- গাড়ির হর্ন, নির্মাণকাজ, মাইকের ব্যবহার, শিল্প-কারখানা থেকে সৃষ্ট শব্দ প্রভৃতি। তবে শব্দদূষণের প্রধান কারণ মোটরযানের হর্ন। তাছাড়া কল-কারখানা এবং নির্মাণকাজ থেকেও শব্দদূষণ সৃষ্টি হচ্ছে।

শব্দদূষণ নীতিমালা ২০০৬ অনুযায়ী, নীরব এলাকা হিসেবে সচিবালয় এলাকায় দিনে শব্দের মাত্রা ৫০ ডেসিবেল থাকার কথা। কিন্তু এক গবেষণায় দেখা যায়, সচিবালয়ের পশ্চিম মসজিদের পাশের এলাকা ছাড়া সব জায়গায় ৭০ ভাগের বেশি সময় ধরে ৭০ ডেসিবেলের (তীব্রতর) বেশি শব্দের মাত্রা ছিল। আর সামগ্রিকভাবে উপাত্ত নেয়া ১২টি স্থানে সম্মিলিতভাবে ৯১ দশমিক ৯৯ ভাগ সময় ৭০ ডেসিবেলের (তীব্রতর) বেশি মাত্রার শব্দ হয়েছিল। তাছাড়া সর্বোচ্চ সময় ধরে তিনটি স্থান- পল্টন বাসস্ট্যান্ড (১০০ ভাগ সময়), জিরো পয়েন্ট (৯৯ দশমিক ৪ ভাগ সময়) এবং কদম ফোয়ারায় (৯৯ দশমিক ২ ভাগ সময়) নিয়মিতভাবে শব্দের মাত্রা ৭০ ডেসিবেলের বেশি ছিল। তার বাইরে ঢাকার আরো ৭০টি এলাকায় ক্যাপসের গবেষণা দল শব্দদূষণ জরিপ চালানো হয়। সেখানেও শব্দের মাত্রা গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি ছিল।

সূত্র জানায়, শব্দদূষণ বিধিমালা অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত শব্দের মাত্রা ৪৫ ডেসিবেল এবং দিনের অন্য সময়ে ৫৫ ডেসিবেলের বেশি থাকার কথা নয়। তবে বাণিজ্যিক এলাকায় তা যথাক্রমে ৬০ ও ৭০ ডেসিবেল থাকার কথা। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অফিস-আদালতের আশপাশে ১০০ মিটার পর্যন্ত নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে শব্দমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে রাতে ৪০ ও দিনে ৫০ ডেসিবেল পর্যন্ত। কিন্তু বাস্তবে ওই শব্দমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না।

বিশেষ করে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে দেখা যায় রাত-দিন পাইলিংয়ের কাজ, ইট ভাঙার যন্ত্র, সিমেন্ট মিকশ্চারের ব্যবহার হচ্ছে। অথচ বিধিমালা অনুযায়ী সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত নির্মাণকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি চালানোয় নিষেধাজ্ঞা আছে।

শহরের প্রধান সড়কগুলোতে চালকদের অপ্রয়োজনীয় হর্ন বাজাতে দেখা যায়। ট্রাফিক সিগন্যাল ও জ্যামে বসেও অনেকে হর্ন বাজায়। নীরব এলাকায় হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ। তারপরও চালকরা তা মানছে না। এমনকি তারা হাসপাতাল-স্কুলের সামনেও উচ্চ শব্দে হর্ন বাজায়।

এদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে শব্দদূষণ সম্পর্কে মানুষের স্বাভাবিক জ্ঞানের অভাব রয়েছে। বিরক্তিকর উচ্চমাত্রার শব্দ মানসিক ও শারীরিক যে কোনো রকমের ক্ষতি করতে পারে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপরই শব্দদূষণ-সংক্রান্ত আইনের বাস্তবায়ন এবং এ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার বিষয়টি নির্ভর করে। পাশাপাশি নাগরিকরা এ ব্যাপারে সচেতন না হলেও শব্দদূষণ রোধ করা যাবে না।

আইনে শব্দদূষণের জন্য একজনের এক মাসের কারাদণ্ড বা ৫ হাজার টাকা জরিমানার অথবা দুই ধরনের দন্ডই প্রদান করার বিধান আছে।

অন্যদিকে শব্দদূষণের কুফল প্রসঙ্গে নাক, কান ও গলারোগ বিশেষজ্ঞ জানান, শব্দদূষণ শুধু কানের ক্ষতিই করে না, এটি মানসিক ও শারীরিক ক্ষতিও করে। অতিরিক্ত শব্দের জন্য শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিকট শব্দের জন্য কানের পর্দাও ফেটে যেতে পারে। এমনকি অন্তঃকর্ণেও অনেক সময় রক্তক্ষরণ হতে পারে। তাছাড়া রাতে নির্মাণকাজের জন্য সৃষ্ট শব্দদূষণেও মানুুষ ঘুমাতে পারে না। আর রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মানুষ দিনে সুস্থভাবে কাজ করতে পারবে না।