করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় কমছে তৈরি পোশাকের রপ্তানি

চ্যানেল ৯৬বিডি.কম,

ঢাকা : করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় দেশের তৈরি পোশাক রফতানি খাতকে আবারো নাজুক অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে কমতে শুরু করেছে রফতানি আদেশ। কারণ করোনার প্রথম ধাক্কা কাটতে না কাটতেই দ্বিতীয় ঢেউয়ে টালমাটাল ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল।

যুক্তরাজ্যে নতুন ধরনের করোনা শনাক্তের খবরে উদ্বেগ আরো বেড়েছে। ইতিমধ্যে ইউরোপের অনেক দেশ লকডাউনে চলে গেছে। অথচ বাংলাদেশের রফতানির প্রায় ৬০ শতাংশই ইউরোপের ওসব দেশে যায়।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডার মতো বড় বাজারেও প্রায় একই দশা। তৈরি পোশাক খাত থেকেই দেশের রফতানির প্রায় ৮৪ শতাংশই আসে। তার মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের কাঁচামাল তুলার দাম বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন আগামী জানুয়ারি থেকে নতুন করে চার মাসের জন্য শ্রমিকদের মজুরির জন্য ২ শতাংশ সুদে সরকারের প্রণোদনা সহায়তা চেয়েছে। বিজিএমইএ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ইতিপূর্বে বছরের এই সময়ে প্রচুর রফতানি আদেশের কারণে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর সক্ষমতার পুরো ব্যবহার হয়ে ওভারটাইমেও কাজ করতে হতো। অথচ এবার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহার হচ্ছে। আর যে ক্রয়াদেশ আসছে, তার দরও ক্রেতারা গড়ে ৫ শতাংশ কমিয়ে দিচ্ছে।

পাশাপাশি বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের অন্যতম কাঁচামাল তুলার দর বৃদ্ধিও নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কাঁচামালের দাম এখন ব্যাপক বেড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউসহ সার্বিক পরিস্থিতির কারণে রফতানি খাতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা তীব্রতর হচ্ছে।

সূত্র জানায়, করোনার প্রথম ধাক্কায় চলতি বছরের মার্চ থেকে রফতানি ব্যাপকভাবে কমলেও জুলাই থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছিল। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওই ধারা অব্যাহত থাকার পর অক্টোবর থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি ফের কমতে শুরু করেছে।

বিজিএমইএর হিসাব অনুযায়ী, চলতি ডিসেম্বরের প্রথম ২০ দিনে এ খাতে সোয়া ৫ শতাংশ রফতানি কমে গেছে। গত বছরের এই সময়ে ১৭৬ কোটি ১৫ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ পোশাক পণ্য রপ্তানি হলেও এবার তা কমে ১৭৩ কোটিতে দাঁড়িয়েছে।

পরবর্তী ২-৩ মাসে রফতানি কেমন হবে তা আন্দাজ করা যায় কাঁচামাল প্রাপ্যতার ঘোষণার ওপর। যা ইউটিলিটি ডিক্লারেশন বা ইউডি নামে পরিচিত। অতীতের একই সময়ের চেয়ে এবার ইউডি নেয়ার পরিমাণ কম। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য কোনো পাওয়া যায়নি।

সূত্র আরো জানায়, দেশের যেসব রফতানিকারক অপেক্ষাকৃত উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানি করে, এই সময়ে তাদের পরিস্থিতি অন্যদের তুলনায় বেশি খারাপ। এই ধরনের পোশাক রফতানির অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠান ভিয়েলাটেক্স।

প্রতিষ্ঠানটির অতীতে এই সময়ে পুরো সক্ষমতার বাইরে ওভারটাইম মিলিয়ে ১২০ শতাংশ কাজ করা হতো। অথচ এখন তার কারখানায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ কাজ হচ্ছে। কারণ উচ্চমূল্যের ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ এখন কমে গেছে।

মূলত করোনায় ফ্যাশন পণ্যের বিক্রি কমায় এর ধাক্কা পড়েছে ওই কারখানার ওপর। পাশাপাশি রফতানি আদেশ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় কাঁচামালের সংস্থান নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সাধারণত ডিসেম্বরের শুরুতে ক্রেতারা রফতানি আদেশ দিয়ে থাকে। তারপর কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হয়। যার বেশির ভাগই চীন থেকে আসে।

এখন ক্রেতারা জানুয়ারিতে অর্ডার দিলে ওই সময়ে তা সংগ্রহ করা দুরূহ হবে। কারণ ওসব কাঁচামাল শিপমেন্ট করতে চীনের নববর্ষ পার হয়ে যাবে। তারপর কাঁচামাল এলে কারখানাগুলো ৩ মাস বন্ধ থাকবে। ফলে জটিলতা আরো বাড়বে।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রফতানির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র পোশাক পণ্য নয়, অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি প্রায় কাছাকাছি। তবে খাদ্যপণ্য রফতানির ক্ষেত্রের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় খাদ্য ও পানীয়সহ হিমায়িত পণ্য রফতানি অপেক্ষাকৃত ভালো।

এদিকে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে অতিসম্প্রতি বিজিএমইএ অর্থসচিবের কাছে চিঠি পাঠিয়ে এক বছরের মোরাটরিয়াম (ঋণের কিস্তি যে সময় পর্যস্ত পরিশোধ করতে হয় না) এবং পরিশোধের জন্য ৫ বছর সময় চেয়েছে। তার আগে গত এপ্রিল থেকে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধে সরকার ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা সহায়তা দিয়েছিল। পরবর্তীতে তা বেড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

অন্যদিকে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর জানান, ধারণা করা হয়েছিল পুনরুদ্ধার পর্ব আগামী মার্চ থেকে শুরু হবে। কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে তা পিছিয়ে আগামী জুলাই পার হয়ে ২০২১ এর শেষ নাগাদ চলে যেতে পারে।

পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ও কম। ফলে সার্বিকভাবে চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণটা পিছিয়ে গেল। কিন্তু এদেশের প্রতিযোগীদের মধ্যে চীন ও ভিয়েতনামের পুনরুদ্ধার পরিস্থিতি ভালো। এ পরিস্থিতিতে প্রধান রপ্তানি খাত পোশাক শিল্প মালিকদের প্রণোদনা চাওয়া নেতিবাচক নয়।

তবে পুরো মজুরির অর্থ না দিয়ে আংশিক দেওয়া যেতে পারে। কারণ যেহেতু তাদের কাজ আছে, পুরো টাকা দেয়ার কোনো মানে হয় না। তাছাড়া ঋণ পরিশোধে দুই বছরের বদলে মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়া যায়। তাতে কারো বিশেষ কোনো ক্ষতি হবে না। তাতে রফতানিকারকরাও কিছুটা দম ফেলার সুযোগ পাবে।

বিদ্যমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ইত্তেফাককে জানান, তার কারখানায় এখন ইউরোপের দেশগুলোর নতুন ক্রয়াদেশ বন্ধ। কেবল সুইডেনের কিছু অর্ডার রয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারির কাজ এই সময়ে প্রক্রিয়াধীন থাকার কথা থাকলেও তা নেই।